বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে স্মার্টফোন শিশুদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে। অনেক অভিভাবক মনে করেন, মোবাইল ফোন শিশুদের জন্য ক্ষতিকর এটি তাদের সময় নষ্ট করে এবং খারাপ অভ্যাসের দিকে ঠেলে দেয়। তবে এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ‘আরিয়ান কিডস একাডেমি’ নামের একটি শিক্ষামূলক অ্যাপ।
এই অ্যাপটির নির্মাতা আনোয়ার ইব্রাহিম, ফাউন্ডার, ডিরেক্টর এন্ড সিইও, উবাবষড়ঢ়বৎ ঈরৎপষব ইউ। তিনি শিশুদের জন্য এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন, যেখানে তারা খেলতে খেলতেই শিখতে পারে।
‘আরিয়ান কিডস একাডেমি’ অ্যাপটিতে রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষামূলক ক্যাটাগরি যেমন গৃহপালিত প্রাণী, বন্য প্রাণী, পাখি, ফল, জলজ প্রাণী ও পোকামাকড়। প্রতিটি ক্যাটাগরিতে রয়েছে আকর্ষণীয় ছবি এবং বাস্তবধর্মী সাউন্ড, যা শিশুদের শেখার অভিজ্ঞতাকে করে তোলে আরও জীবন্ত ও আনন্দময়।
অ্যাপটির বিশেষত্ব হলো, এটি শিশুদের শেখাকে কেবল তথ্যভিত্তিক না রেখে একটি ইন্টার্যাক্টিভ অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করেছে। ফলে শিশুরা সহজেই নতুন শব্দ, প্রাণী, ফল ও পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে।
আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, “আমরা সাধারণত মোবাইল ফোনকে শিশুদের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে দেখি। কিন্তু সঠিক কনটেন্ট ও দিকনির্দেশনা থাকলে এটি হতে পারে একটি শক্তিশালী শিক্ষার মাধ্যম।”
অ্যাপ তৈরির পেছনের ভাবনা
এই অ্যাপটির সূচনা হয়েছিল একটি ব্যক্তিগত প্রয়াস থেকে। ‘আরিয়ান কিডস একাডেমি’ মূলত তৈরি করা হয়েছিল শিশু আরিয়ানের জন্য। শিশুদের মোবাইল ফোনে আসক্তির বিষয়টি সামনে রেখে, সেই একই ডিভাইসকে কীভাবে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায় এই চিন্তা থেকেই অ্যাপটি তৈরি করা হয়। এটি ছিল এক ধরনের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ, যার লক্ষ্য ছিল মোবাইলভিত্তিক শিক্ষার কার্যকারিতা যাচাই করা।
বর্তমানে এই উদ্যোগ সফলভাবে কাজ করছে এবং প্রমাণ করছে যে, সঠিক পরিকল্পনা ও কনটেন্টের মাধ্যমে মোবাইল ফোন শিশুদের শেখার একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
প্রযুক্তি ও ডিজাইন
অ্যাপটি সহজ ও ব্যবহারবান্ধব ডিজাইনে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ছোট শিশুরাও সহজেই ব্যবহার করতে পারে। প্রতিটি ফিচার এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে শিশুরা কোনো জটিলতা ছাড়াই শেখার অভিজ্ঞতা উপভোগ করতে পারে।
শিশুদের ওপর ইতিবাচক প্রভাব
এই অ্যাপটি শিশুদের শুধু নতুন জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে না, বরং তাদের মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে ছবি ও শব্দের সমন্বয় শিশুদের শেখার প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
মা ও শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ এস. এম. মাসুম ইকবাল বলেন, “বর্তমান সময়ে শিশুরা মোবাইল ডিভাইসের প্রতি অতিরিক্ত আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে, যার ফলে তাদের স্বাভাবিক মেধা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কথা বলার দক্ষতাও ঠিকমতো গড়ে উঠছে না। তিনি মনে করেন, এ ধরনের শিক্ষামূলক অ্যাপ শিশুদের ভাষা শেখা এবং দ্রুত কথা বলার সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে, পাশাপাশি তাদের সামগ্রিক মেধা বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে ইংরেজি শিক্ষক রেজাউল করিম বলেন, “বর্তমান সময়ে অধিকাংশ শিশু বিভিন্ন গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে, যার ফলে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। শিশুদের হাতে বই তুলে দিলেও তারা অনেক সময় তা পড়তে চায় না। তবে যেহেতু তারা মোবাইল ফোনের প্রতি আগ্রহী, তাই এই আগ্রহকে ইতিবাচক পথে ব্যবহার করে শিক্ষামূলক অ্যাপের মাধ্যমে তাদের শেখার অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি মনে করেন, ‘আরিয়ান কিডস একাডেমি’ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
উবাবষড়ঢ়বৎ ঈরৎপষব ইউ-এর সিইও আনোয়ার ইব্রাহিম জানান, “আমাদের এই উদ্যোগটি মূলত একটি গবেষণামূলক প্রচেষ্টা ছিল। যেহেতু এর ইতিবাচক ফলাফল আমরা বাস্তবে দেখতে পাচ্ছি, তাই এখন আমরা বৃহত্তর পরিসরে কাজ করতে চাই। আমি এবং আমার টিম এই নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছি এবং খুব শিগগিরই সকল শিশুদের জন্য এই অ্যাপটি উন্মুক্ত করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার শিশুদের মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা ও শেখার ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। ‘আরিয়ান কিডস একাডেমি’ সেই সম্ভাবনাকেই বাস্তবে রূপ দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, এই অ্যাপটি প্রমাণ করছে মোবাইল ফোন শুধুই বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং এটি হতে পারে শিশুদের জ্ঞান অর্জনের এক কার্যকর ও আধুনিক প্ল্যাটফর্ম।
খুলনা গেজেট/এনএম

